অভিজিৎ ব্যানার্জি, ঢাকা: চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গঠন। কিন্তু সম্প্রতি ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক বৃত্তে বন্দি। এ বাজেট গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশ আজ এক গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। এই ক্রান্তিলগ্নে প্রচলিত ঋণ-নির্ভর ও মাফিয়াবান্ধব বাজেটের বিপরীতে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন, কৃষি, শিল্প সুরক্ষা ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। এসব দাবিতে এক যৌথ বাজেট সংশোধনী ও অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা প্রস্তাব করেছে তিনটি সংগঠন।
গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (DRU) মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’, ‘অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশ’ এবং ‘বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে এই প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়। তিন সংগঠনের পক্ষে এই লিখিত প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া। প্রস্তাবনার মূল পয়েন্টগুলো হলো:
১. ঋণের দুষ্টুচক্র ও সরকারি ব্যয় সংকোচন: দেশের আন্তর্জাতিক ঋণ বিপজ্জনকভাবে জিডিপির ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধ করতে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে অনুৎপাদনশীল মেগা প্রকল্প ও আমলাতান্ত্রিক বিলাসী ব্যয় অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পাচারকৃত ২৮ লক্ষ কোটি টাকা ফেরত এনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিনা সুদে ঋণ দিতে হবে এবং এবারের বাজেট থেকে অন্তত ৩ লক্ষ কোটি টাকা পাচারের যে আশঙ্কা রয়েছে তা রুখতে হবে।
২. বিদ্যুৎ খাতের লুটপাট ও ক্যাপাসিটি চার্জ: বিদ্যুৎ খাতের রেন্টাল, কুইক রেন্টাল এবং অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অলস বসে অঢেল টাকা লুটপাটের সুযোগ বন্ধ করতে হবে।
৩. আর্থিক সুশাসন ও স্বাধীন অডিট: অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইনান্স ডিভিশন’ অবিলম্বে বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, মহা হিসাব-নিরীক্ষকের (CAG) দপ্তরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে আন্তর্জাতিক মানের অডিট ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. কর কাঠামো ও কৃষি সুরক্ষা: ব্যক্তি ও যৌথ সম্পত্তির ওপর ৩% পর্যন্ত সম্পদ কর প্রবর্তন ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে হবে। করমুক্ত আয়সীমা ৪,৫০,০০০ টাকা করা, খাস জমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ এবং কৃষিপণ্যের মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের অন্তত দেড়গুণ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
৫. বাংলা সন-ভিত্তিক অর্থবছর ও বিকেন্দ্রীকরণ: দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার হিসেবে জুনের বৃষ্টিতে ঠিকাদারি হরিলুট ও অপচয় বন্ধ করতে জুলাই-জুনের পরিবর্তে ‘বাংলা সনের’ (বৈশাখ-চৈত্র) সাথে মিলিয়ে অর্থবছর পুনর্নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। একই সাথে বাজেট তৈরির প্রক্রিয়া আমলাদের কুক্ষি থেকে মুক্ত করে ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার উপযোগী এআই (AI), আইওটি (IoT) ভিত্তিক অ্যাগ্রোটেক এবং ব্লু ইকোনমির দুয়ার উন্মোচনের আহ্বান জানানো হয়।
প্রস্তাবনা পাঠকালে দিদার ভূঁইয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “আমরা যদি দেশের সীমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কেবল মাফিয়াদের ভোগে ঠেলতে থাকি, তাহলে এই জাতির কোনো ভবিষ্যৎ থাকবে না। তাই সকল সম্ভাবনা শেষ হবার আগেই, এই বছর থেকেই বাজেটকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাতে হবে।”
সভায় সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম বলেন, “সংস্কার প্রক্রিয়া রুখে দেবার ষড়যন্ত্রেই আদালতের রায় অমান্য করে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনকে নিবন্ধন দেওয়া হয় নাই। সংস্কার হলে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণে কৃষকের ভূমিকা মুখ্য থাকবে। নাগরিকের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে তাদের বিরুদ্ধে আইন বানানোর সুযোগ কমে যাবে। দেশে এখন প্রতিদিন যে গড়ে ১০টি খুন হয়, দেশটা যে ড্রাগে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে—নাগরিকদের বিরুদ্ধে এসব রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র ও ব্যর্থতা কমবে।”
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “বর্তমান সরকার সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এজন্য তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার অধ্যাদেশগুলো জাতির সাথে প্রতারণা করে বাতিল করে দিয়েছে।”
অহিংস গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনের সিনিয়র সহ-সভাপতি আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার নজরুল হক বলেন, “এবারের বাজেটে আমাদের প্রত্যেক নাগরিকের পকেট থেকে গড়ে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। এই টাকা কোন খাতে খরচ হবে, কত টাকা এখান থেকে লুটপাট আর পাচার হবে—সেই হিসাব আমাদের দিতে হবে।”
বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক শেখ নাসিরউদ্দিন বলেন, “সংসদে আমাদের সত্যিকারের প্রতিনিধি আমরা পাঠাতে পারি না। নির্বাচন ব্যবস্থা সেই লক্ষ্যেই সাজানো। নিজেদের পক্ষের রাষ্ট্র চাইলে আমাদের নিজেদের প্রতিনিধিকে সংসদে পাঠাতে হবে।”
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন; জাস্টিস ও ডেভেলপমেন্ট পার্টি (জেডিপি)-এর আহ্বায়ক নাঈম আহমেদ; নারী নেত্রী জাকিয়া শিশির; নেটওয়ার্ক ফর পিপল’স অ্যাকশন (এনপিএ)-এর সংগঠক কৌশিক আহমেদ; নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শর্মী হোসেন; সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট মনসুরুল হাই সোহান এবং গণঅভ্যুত্থানে আহত গবেষক ফারহান হোসেন জয় প্রমুখ।