অভিজিৎ ব্যানার্জি, ঢাকা: রাজধানীর খিলক্ষেত থানার মস্তুল এলাকার ৩০০ ফুট সড়কে প্রায়ই দূর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গত কয়েক মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যুব দলের কর্মী, বাইকার, পথচারী এবং লোকাল লোকজন ছাড়াও অনেকের দূর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও প্রশাসনের কোন টনক নড়ে নি। বিশেষ করে ঐ এলাকার মস্তুল ডুমনি ব্যস্ততম মোড়ে ফুট ওভার ব্রিজ না থাকায় ঐ স্থানে অনেক দূর্ঘটনা ঘটে।
দূর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা পাবার জন্য স্থানীয় ৪৩ ওয়ার্ড এর সাধারণ জনগন বেশ কয়েকবার মানববন্ধন করেছেন।বিশেষ করে ৪৩ ওয়ার্ড এর কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জনাব মো: ইমরান হোসেন ব্যাপারীর নেতৃত্বে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়। ইমরান হোসেন ব্যাপারী বলেন, প্রায় ২৫-৩০ হাজার মানুষ মস্তুল ডুমনি ব্যস্ততম মোড়ের রাস্তার দুই পারে বসবাস করে। প্রতিদিন ৫-৭ হাজার মানুষ এই রাস্তা দিয়ে এপার-ওপার পারাপার হয়। এখানে প্রায় প্রতিমাসে একাধিক সিরিয়াস দূর্ঘটনা ঘটে, গত পাঁচ বছরে প্রায় কয়েকশত দূর্ঘটনা ঘটেছে এবং প্রায় ৪০ জন অকাল মৃত্যু বরণ করেছে। ফলে শতশত মানুষ দূর্ঘটনা জনিত কারণে অঙ্গহানী ঘটেছে।
অথচ এই মোড়ের মাত্র ৪০০ গজ পশ্চিমে একটি ফুট ওভার ব্রিজ অপরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং প্রায় অকেজো এই ফুটওভার দিয়ে কোন মানুষ পারাপার হয় না। অনেক সময় পার হলেও কোন মানুষ তো দুরের কথা কুকুরও পার হবার দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় না। অথচ মস্তুল-ডুমনি মোড় (বিয়ে বাড়ী রেষ্টুরেন্ট) এর উওর পাশে ডেলনা গ্রাম, তলনা গ্রাম, মস্তুল গ্রাম, তলনা রুহুল আমিন উচ্চ বিদ্যালয়,৭টি মাদ্রাসা, দক্ষিণ পাশে ডুমনি গ্রাম, নয়া পাড়া, টেক পাড়া, নুর পাড়া, খাইলাত পাড়া, শিয়ালদি পাড়া, আহাবর পাড়া, পাতিরা গ্রাম অবস্থিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই এলাকায় আমিরজান স্কুল & কলেজ, ডুমনি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডুমনি হাইস্কুল & কলেজ, নুরপাড়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা, প্রাণ- আরএফএলের শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ৫-৭ হাজার মানুষ এই রাস্তা দিয়ে এপার-ওপার পারাপার করে। অনেক বাচ্চা এবং মহিলা আতংক নিয়ে রাস্তা পার হয়।
সরকারের সদিচ্ছা থাকলেই আধা মাইল দূরের এই ফুট ওভার ব্রিজটি মস্তুল-ডুমনি মোড়ে স্থাপন করা যায়। ৪৩ ওয়ার্ড এর কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জনাব মো: ইমরান হোসেন ব্যাপারী অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন প্রায় ৩০ হাজার নাগরিক এই স্থান টি নিয়ে আতংকে থাকতে হয়। এর আগেও স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক বার মানববন্ধন এবং সড়ক অবরোধ করেন সাধারণ জনগন।
মস্তুল-ডুমনি মোড় (বিয়ে বাড়ী রেষ্টুরেন্ট) এর মালিক সিদ্দিকুর রহমান, স্থানীয় মুফতি উসমান কাসেমী, স্থানীয় মসজিদের ইমামসহ ছাত্র ছাত্রীরা জানান, গত এক মাসে ঢাকার পূর্বাচলে ৩০০ ফিট সড়কে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ জন। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে নিহত হয়েছেন বুয়েটশিক্ষার্থী মোহতাসিম মাসুদসহ আরও ৫ জন। এছাড়া আনোয়ার হোসেন নামে এক যুবদল নেতা নিহত হয়েছেন।
তারা আরো জানান, এর আগেও মাস্তুল এলাকা থেকে কাজ শেষে মনির তাঁর সহকর্মীকে বাইসাইকেলে নিয়ে দুজন তাঁদের বাসায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে মস্তুল নামক এলাকায় ৩০০ ফুট সড়কে চলন্ত একটি মোটরসাইকেল তাঁদের বাইসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে তাঁরা দুজন বাইসাইকেল থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়েন। মনির হোসেন খিলক্ষেতের ডুমনি এলাকায় থাকেন। এই সময় রাতে যোগাযোগ করা হলে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দুর্ঘটনায় বাইসাইকেল আরোহী এক যুবক মারা গেছেন। তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাঁর বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর হতে পারে। খিলক্ষেত থানার সহকারী উপপরিদর্শক সাইদুল ইসলাম জানান, তিনি কুর্মিটোলা হাসপাতালে গিয়ে জেনেছেন মনির হোসেন ছাড়াও মোটরসাইকেলের দুই আরোহীকে ওই হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়ক যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনই ভয়ঙ্কর। প্রতিনিয়ত সড়কটিতে ঘটছে দুর্ঘটনা। দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) গভীর রাতে সড়কের নীলা মার্কেট এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন মুহতাসিম মাসুদ (২২) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।
নিহত মুহতাসিম মাসুদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দুই শিক্ষার্থী।
শুধু বুয়েট শিক্ষার্থী মাসুদই নয়, প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা অথবা অন্য কোনো কারণে ৩০০ ফুট ও আশপাশের এলাকা থেকে লাশ উদ্ধারের খবর আসছে। গত মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) সকালে সড়কের বউরারটেক এলাকার ৪ নম্বর সেতুর নিচের লেকপাড় থেকে সুজানা (১৮) নামে এক কলেজছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন সকালে একই স্থান থেকে সুজানার বন্ধু শাইনুর রশিদ কাব্যর (১৬) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে ৮ ডিসেম্বর ৩০০ ফিট সড়কে মুরগি বহনকারী একটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্য একটি গাড়ির পেছনে ধাক্কা লেগে সাকিবুল হাসান সাকিব (১৪) নামে এক মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হয়। এ সময় আহত হয় আরও তিনজন।
কেন সড়কটিতে এত দুর্ঘটনা এমন প্রশ্নে অনেকেই বলছেন, মূলত ৩০০ ফিট সড়কের রাতের মায়াবী দৃশ্য দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসে নগরবাসী। তবে গাড়ির বেপরোয়া গতি আর বাইকারদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে সড়কটি।