ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা সদর গঠন নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ: বৈষম্য নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায় এলাকাবাসী

অভিজিৎ ব্যানার্জি, ঢাকা:   ফটিকছড়ির বিশাল উত্তরাঞ্চলকে প্রশাসনিক ভোগান্তি ও দীর্ঘদিনের বৈষম্য থেকে মুক্ত করতে ১২১তম নিকার (NICAR) সভায় দেশের ৫০১তম উপজেলা হিসেবে “ফটিকছড়ি উত্তর” অনুমোদিত হয়। এই নতুন উপজেলা গঠন ও সদর নির্ধারণের জন্য স্থানীয় প্রশাসন বাগান বাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট ও ভূজপুর—এই চারটি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করেছিল।কিন্তু স্থানীয়দের মাঝে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে নবগঠিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর দপ্তর স্থাপন এবং সীমানা নির্ধারণ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। 

এরই প্রেক্ষিতে গতকাল (১১ জুলাই ২০২৬) ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৩য় তলায় মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সচেতন নাগরিক পরিষদের নেতৃবৃন্দ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান-এর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই বৈষম্যমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলিত ও বঞ্চিত উত্তর ফটিকছড়ির সাধারণ মানুষের দাবি উপেক্ষা করে, গণশুনানির রায় জালিয়াতির মাধ্যমে উপজেলা সদর দপ্তর পুনরায় দক্ষিণের অঞ্চলের দিকে স্থানান্তরের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

​গণশুনানি উপেক্ষা ও জালিয়াতির অভিযোগে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এডভোকেট মো: মিজানুর রহমান চৌধুরী। এই সময় সাংবাদিকদের সাথে দিকনির্দেশনা মূলক বক্তব্য দেন এডভোকেট মো: ইউসুফ আলাম মাসুদ, এডভোকেট মো: সাইফুদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকী, গিয়াস উদ্দিন আল মামুনসহ সচেতন নাগরিক পরিষদের সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ।

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনাব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী (বর্তমানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ मंत्रालয়ে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত) এবং বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের দুই ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের যোগসাজশে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী উপজেলা পরিষদের রেজুলেশন ও মানচিত্র জালিয়াতি করেছে। তারা ইন্টারিম সরকারের আমলে সচিবালয়ে ভুল ও মিথ্যা তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে গণশুনানির রায়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। বাসিন্দাদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও কোনো প্রকার গণশুনানি ছাড়াই দক্ষিণের ০৫নং হারুয়ালছড়ি ও ১১নং সুয়াবিল ইউনিয়নকে এই নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বর্তমান উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৫-৬ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।

​জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র:

উত্তর ফটিকছড়ির জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বক্তারা বলেন, দেশের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের মানুষকে ক্ষিপ্ত করে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই তৎকালীন ইউএনও মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এবং পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের লোকজনের যোগসাজশে অতি সূক্ষ্মভাবে দূরত্বের নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে নিকার সভায় তড়িঘড়ি করে এ তথ্য উপস্থাপন ও অনুমোদন করানো হয়েছে।

তাই সংবাদ সম্মেলনে সচেতন ​নাগরিক পরিষদ ৩টি মূল দাবি জানায়। দাবি গুলো হল- 

১. গণশুনানির সুপারিশ ও সুপারিশকৃত রায় অনুযায়ী নারায়ণহাটের উত্তরে যেকোনো সহজ যোগাযোগযুক্ত স্থানে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর দপ্তর স্থাপন করতে হবে।

২. ফ্যাসিস্ট আমলের দোসর ও সাবেক ইউএনও মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী কর্তৃক রচিত এই মানচিত্র ও তথ্য জালিয়াতির ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে হবে এবং ভুল তথ্য উপস্থাপন ও ডকুমেন্টস জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করায় তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

৩. এই সংকটের গভীরে গিয়ে সঠিক সমাধানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

দাবিগুলো না মানলে তারা ​আপোষহীন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি প্রদান করে। তারা বলেন, বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়ন এবং ১১নং সুয়াবিল ইউনিয়নের ছাত্র, যুবসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলন থেকে নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকার এত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত দাবি উপেক্ষা করতে পারে না। অনতিবিলম্বে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হলে নাগরিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান এই আন্দোলন আরও তীব্র ও আপোষহীন রূপ নেবে।

​রাজস্বের ৭০ ভাগ দিয়েও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত উত্তরাঞ্চল:

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাট—এই ৩টি ইউনিয়ন প্রায় ৩০১ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যেখানে প্রায় দুই লক্ষ মানুষের বসবাস। কৃষি, চা শিল্প, রাবার শিল্প ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল থেকে পুরো ফটিকছড়ি উপজেলার সিংহভাগ (Customer/Govt Revenue) অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ রাজস্ব অর্জিত হয়। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই অঞ্চল চরম অবহেলিত।

​রাজস্বের সিংহভাগ উত্তরাঞ্চল থেকে এলেও হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, আদালত ভবন, সরকারি কলেজ এবং থানার মতো সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অবকাঠামো গড়ে উঠেছে দক্ষিণ অঞ্চলে। বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দূরত্বের কারণে গত ৯ জুলাইও (বৃহস্পতিবার) যথাসময়ে ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে না পারায় উত্তর ফটিকছড়ির দুটি বড় মার্কেট পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন যদি নতুন উপজেলার হেডকোয়ার্টারও উত্তরাঞ্চল থেকে সরিয়ে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত “পশ্চিম ভূজপুর” তথা দক্ষিণের অংশে স্থাপন করা হয়, তবে তা হবে উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত মানুষের সাথে চরম তামাশা ও অভিনব প্রতারণা।

​উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি: 

এর আগে গত ৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে ১ সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না পাওয়ায় আজ রাজধানীর বুকে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয় বলে জানান আয়োজকরা।

More From Author

সরকারের সদিচ্ছাই পারে মস্তুল-ডুমনি মোড়ে ফুট ওভার ব্রিজটি পুনঃস্থাপন করতে- ইমরান হোসেন ব্যাপারী

ডিমের ন্যায্যমূল্য ও ডিজিটাল ডেটাবেজ সহ পোলট্রি খাতের উন্নয়নে যে দাবি জানিয়েছে বিপিআইএর সভাপতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recent Comments

No comments to show.