সুমাইয়া আক্তার, ঢাকা: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থ-বছরের জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে। আজ ২১ মে, ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) সকাল ১১:০০ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের আকরাম খাঁ মিলনায়তনে প্রতিবন্ধী অধিকার ও উন্নয়ন সংস্থা “বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এন্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)”- এর উদ্যোগে এবং সাইটসেভার্স- এর ‘সমতার বাংলাদেশ” ক্যাম্পেইন-এর আওতায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবিমালা উত্থাপন করা হয় ।
তারা বিএনপি সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বাজেট বরাদ্দ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি করেন। আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় উত্থাপিত প্রধান দাবিমালাসমূহ হল-
ভাতা বৃদ্ধি ও উপবৃত্তি: বর্তমান মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে প্রতিবন্ধিতার মাত্রার ভিত্তিতে মাসিক ভাতা সর্বনিম্ন ২,৫০০ টাকা করা। এছাড়া ন্যূনতম ৩ লক্ষ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ২,০০০ টাকা শিক্ষা উপবৃত্তি বরাদ্দ করা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভাতা ও উপবৃত্তি উভয়ই একসাথে পাওয়ার বিধান চালু করা।
১০০০ কোটি টাকার উদ্যোক্তা তহবিল: প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে ১,০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা এবং সকল তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে মাত্র ৪% সুদে এই ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করা।
প্রতিবন্ধী বেকার বীমা চালু: যেসকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ২০০-র বেশি কর্মী রয়েছে, তারা ৫% প্রতিবন্ধী কর্মী নিয়োগ না দিলে সেই শূন্য কোটার অর্থ দিয়ে তহবিল গঠন করা। উক্ত তহবিল থেকে ৫০ হাজার কর্মক্ষম প্রতিবন্ধী যুবককে মাসিক ৮,০০০ টাকা করে (সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত) বেকার বীমা প্রদান করাকরমুক্ত আয়সীমা ও করছাড়: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করমুক্ত আয়সীমা ৫ লক্ষ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৬ লক্ষ টাকা করা। নারী উদ্যোক্তাদের ন্যায় প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদেরও ৭০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়কর ছাড়ের সুবিধা এবং পূর্বে কার্যকর থাকা ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ‘চিকিৎসা ভাতা করছাড়ের সুযোগটি পুনর্বহাল করা।
ব্যক্তিগত সহায়তাকারী (কেয়ারগিভার) ভাতা: নিবন্ধিত ৪০ লক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে ১% গুরুতর প্রতিবন্ধী (৪০ হাজার ব্যক্তি) মানুষের স্বাধীন জীবনযাপনের জন্য ব্যক্তিগত সহায়তাকারী নিয়োগে মাসিক ৬,০০০ টাকা হারে ২৮৮ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া।
সহায়ক উপকরণের শুল্কছাড় ও সারচার্জ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত ৫০টি সহায়ক উপকরণের ওপর সবরকম শুল্কছাড় ও আমদানিতে কর অব্যাহতি কার্যকর করা। তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ওপর ১ শতাংশ ডিজেবিলিটি সার্চচার্জ (সম্পূরক শুল্ক) আরোপ করে সেই অর্থ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়ক উপকরণ প্রদানে বরাদ্দ করা।প্রবেশগম্যতা ও যানবাহন আমদানি: ৬৪টি জেলার গণস্থাপনাগুলোর প্রবেশগম্যতা যাচাই (এক্সেস অডিট) ও সংস্কারের জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন (ডিপিও)-এর তত্ত্বাবধানে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাধীন চলাচলের জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ প্রদান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায় ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে ১০০% নিবন্ধন ফি মওকুফের বিধান রাখাসংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য ও মূল দাবিমালা উপস্থাপন করেন বি-স্ক্যান-এর পরিচালক ইফতেখার মাহমুদ এ সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবন্ধী অধিকার কর্মী এবং অভিভাবক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে বি-স্ক্যান’র নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব বলেন, “আমরা সরকারের কাছে অনুকম্পা বা দয়া চাই না, বরং বাজেটের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের সঠিক প্রতিফলন দেখতে চাই। আমাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না দিয়ে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন করা অসম্ভব। সাইটসেভার্স-এর সমতার বাংলাদেশ ক্যাম্পেইনের এই প্ল্যাটফর্ম থেকে আমরা যৌথভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।” এজন্য তিনি বিশ্ব প্রবেশগম্যতা সচেতনতা দিবস উপলক্ষে সরকার অবিলম্বে প্রবেশগম্য গণস্থাপনায় বাজেটবরাদ্দ ও বাস আমদানিতে শুল্কছাড়ের দাবি।
পরিচালক ইফতেখার মাহমুদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহৃত সহায়ক উপকরণ কোনো বিলাসী পণ্য নয়, এটি আমাদের স্বাধীন চলাচলের অধিকার। তাই এগুলো আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং একই সাথে প্রস্তাবিত ১০০০ কোটি টাকার উদ্যোক্তা তহবিল দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।”সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিদের পক্ষে আরো বক্তব্য রাখেন জনাব মাসুদ আনোয়ার খান মিরাজ, সহসভাপতি, ভিপস, উজ্জলা বণিক, সভাপতি, এসপিইউএস, জাকির হোসেন, নির্বাহী পরিচালক, ডিডিপি, হানিফ মিয়া, প্রচার সম্পাদক, জেপিকেএস, লিয়াকত আলী, সভাপতি, এপিপিইউএস। বক্তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদপ্তরকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সমৰ্থন এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রতিবন্ধী-সংবেদনশীল বাজেট বাস্তবায়নের জোর আহ্বান জানান ।