সুমাইয়া আক্তার, ঢাকা: প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্যই সমগ্র পৃথিবীকে সুরক্ষা দিচ্ছে। আর প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষা করছে জীব-বৈচিত্র্য। প্রতিটি জীব পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল এবং আমাদের অস্তিত্বকে রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু উদাসীনতা ও ভোগবাদী আচরণের কারণে প্রতিনিয়ত আমরা এই জীব-বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছি। তাই জীবজগতের ভারসাম্য বজায় রাখা ও পরিবেশের সুরক্ষার স্বার্থে সব জীবকেই বাঁচার সুযোগ দিতে হবে। প্রকৃতি কেবল সৌন্দর্য নয়; মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল ভিত্তি।
আজ ২১ মে ২০২৬ , আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে স্টেট ইউনিভার্সিটি- বাংলাদেশ, পিএসডিআই ফাউন্ডেশন এবং ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট কর্তৃক সম্মিলিতভাবে আয়োজিত “স্থানীয় উদ্যোগ, বৈশ্বিক প্রভাব” শীর্ষক অনলাইন সভায় বক্তারা একথা বলেন। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর পরিচালক গাউস পিয়ারীর সভাপতিত্বে ও সংস্থার কমিউনিকেশন অফিসার শানজিদা আক্তারের সঞ্চালনায় সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, স্টেট ইউনিভার্সিটি- বাংলাদেশ এর স্কুল অব হেলথ সায়েন্সেস ও পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেন এবং প্লাটফর্ম ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ইনিসিয়েটিভ (পিএসডিআই) ফাউন্ডেশন এর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সাহিদা পারভীন।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক শেখ তানিম, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস এর শিক্ষার্থী সাগুফতা আরিরা প্রজ্ঞা, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শর্মি দত্ত, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শাহারিয়ার ইসলাম প্রীতম।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। প্রকৃতিতে বিরাজমান জীব-বৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করলে আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদী-খাল দখল ও দূষণ, অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার, বন উজাড়, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্মুক্ত মাঠ-পার্ক কমে যাওয়ার কারণে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ছোট ছোট সচেতন উদ্যোগ বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সাহিদা পারভীন বলেন, শহরে গাছপালা কমে যাওয়ায় জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, মাটির ক্ষয়, বন্যা এবং বৃষ্টিপাতের তারতম্য, তাপদাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সামগ্রিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে ত্বরান্বিত করে। এসিতে ব্যবহৃত রেফ্রিজারেন্ট যেমন-সিএফসি এবং এইচএফসি গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়ে ওজোন স্তরের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ হয়। নদী ও জলাশয় দূষিত হওয়ার ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হচ্ছে এবং জলজ প্রাণী, শৈবাল, প্রবালসহ সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। ওষধি গাছ সংরক্ষণ করার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি কারণ এটি বনের বাস্তুতন্ত্র এবং সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে।
গাউস পিয়ারী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুল-কলেজ ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রচারণা জরুরি। পরিবেশ ও জীব- বৈচিত্র্য সুরক্ষায় তরুণদের চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে কাজের সাথে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, তামাক স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তামাক চাষ আবাদ যোগ্য ভূমির উর্বরতা নষ্ট করছে। অথচ তামাক কোম্পানি জনস্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে ব্যবসায়িক মুনাফা লাভের আশায় তামাক চাষ করছে।
সভা থেকে প্রতিটি শহরে নির্দিষ্ট পরিমাণ উন্মুক্ত মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণ, নদী-খাল ও জলাভূমি দখলমুক্ত রাখতে কঠোর আইন প্রয়োগ, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার প্রদান, নতুন ভবন নির্মাণে সবুজায়ন নিশ্চিতকরণ, স্থানীয় খাবার ও দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি ও সহজলভ্য করা, দেশীয় গাছ ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা বাড়ানো, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ে পাঠদান, ছাদকৃষি ও নগর কৃষিতে কর প্রণোদনা দেওয়া, হাঁটা, সাইকেল ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহী করা, নগরের অভ্যন্তরে উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও খেলার মাঠ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুপারিশ তুলে ধরা হয়।