BRTA, BRTC এবং DTCA এর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারসহ জবাবদিহিতা থাকতে হবে

খাইরুল আলম, ঢাকা:   সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য এমনকি পুরো পরিবার নিহতের ঘটনা বাড়ছে। গতবার ভার যানবাহ সঙ্গে সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যানের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৪০টি পরিবার পুরোপুরি নিহত হয়েছে। ইদানিং মহাসড়কে বিকল হওয়া পণ্যবাহী যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকছে। এই অবস্থায় বেপরোয়া গতির অপর যানবাহন প যানবাহনের পেছনে থাকা নিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। গত বছর এধরনের ১১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ক অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্মিত উঁচু স্পীড ব্রেকারের কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে।

২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন ও সংস্কার নিয়ে সুপারিশসমূহ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। গতকাল ১০ জানুয়ারি ২০২৫ইং রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিস্তারিত সুপারিশ এবং কারণ উল্লেখ করেন।

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ:

১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. ওভার লোভ; ৪. চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা; ৫. চালকদের বেতন-কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৬. ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো; ৭. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৮. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৯. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ১০. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ১১. বিআরটিএ’র সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি; ১২. আইন প্রয়োগে দুর্বলতা; ১৩. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

সুপারিশসমূহ:

১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (NRSC) পুনর্গঠন করে এই কাউন্সিলের অধীনে BRTA, BRTC এবং DTCA পরিচালনা করতে হবে। কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতে হবে।

২. BRTA, BRTC এবং DTCA এর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

3. BRTA, BRTC এবং DICA এর শীর্ষ পদে প্রশাসন ক্যাডারের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষ-অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।

৪. মোটরযানে ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (ITS), গ্লোবাল পোজিশনিং সিস্টেম (GPS) এবং রোড ট্রাফিক সেফটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (RTSMS) ইত্যাদি আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৫. সড়ক নিরাপত্তা আইন (Road Safety Act) প্রণয়ন করতে হবে।

৬. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ পণ্যবাহী যানবাহন দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে।

৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে।

৮. চালকদের বেতন, কর্মঘন্টা, স্বাস্থ্যসেবা-সহ পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

৯. মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে IoT (Internet of Things) প্রযুক্তি এবং মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। ১০. অটোরিকশা এবং নসিমন-ভটভটি ইত্যাদি ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করে নিবন্ধন ও চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

১১. স্বল্প গতির ছোট যানবাহনের জন্য সকল মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ-সহ নিরাপদ রোড ডিজাইন করতে হবে।

১২. নিয়মিত রোড সেফটি অডিট (Road Safety Audit) করতে হবে।

১৩. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানীভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করতে হবে।

১৪. রাজধানীর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাস সার্ভিস বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রয়োজনে আমদানী শুল্ক কমিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে বাস ক্রয়ের জন্য ঋণ প্রদান করা যেতে পারে।

১৫. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, তাঁরা জনপ্রশাসন পরিচালনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৬. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

১৭. সকল রেল ক্রসিংয়ে গেইট-কীপার নিয়োগ করতে হবে।

১৮. মহাসড়কের পাশে ট্রমা-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করতে হবে।

১৯. সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। এতে করে তিনটি যোগাযোগ মাধ্যমে সমন্বিত উন্নয়ন সম্ভব হবে। ফলে, দেশে একটি পরিকল্পিত ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে

২০. সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য ট্রাস্ট ফান্ডে বছরে ৭ শত কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমান্বয়ে কমলে ফান্ডের অর্থের পরিমাণও কমবে ।

২১. গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিচিতিঃ

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৩২ জন, সেনা সদস্য ৫ জন, র‍্যাব সদস্য ৩, বিজিবি সদস্য ৪ জন, আনসার সদস্য ৪ জন, কায়ার সার্ভিস সদস্য ২, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন শিক্ষক-সহ স্কুল- মাদরাসা-কলেজের শিক্ষক ১২৯ জন, প্রকৌশলী ১৯ জন, চিকিৎসক ২৪ জন, আইনজীবী ২৬ জন, সাংবাদিক ৪২ জন, ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা-কর্মচারী ৮৯ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১৩ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ২২১ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৯১ জন, গরু ব্যবनারী ১৫ জন, ইউপি চেয়ারম্যান ২ জন, ইউপি সদস্য ও জন-সহ স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ১৪৬ জন, হাফেজ- ইমাম ৩২ জন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ১ জন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ১ জন, বিপিএটিসি’র কর্মকর্তা ১ জন, ডিসি অফিসের কর্মকর্তা ১ জন, পাউবি কর্মকর্তা ১ জন, কারারক্ষী ১ জন, নৃত্যশিল্পী ১ জন, উদীচী কর্মী ১ জন, বিআরবি ক্যাবলন কর্মচারী ২ জন, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী ২ জন, হাসপাতাল ক্লিনার ২ জন, রেলওয়ে কর্মী ১ জন, পোশাক শ্রমিক ৭১ জন, মৎসজীবী শ্রমিক ৪ জন, চা শ্রমিক ২ জন, মোটর মেকানিক ৯ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৫০ জন, ধানকাটা শ্রমিক ১০ জন, তাত শ্রমিক ৪ জন, ইটভাটা শ্রমিক ১৪ জন, রাজমিস্ত্রি ১৬ জন, রঙ মিস্ত্রি ৭ জন, কাঠমিস্ত্রি ২ জন, বিদ্যুৎ মিস্ত্রি ৫ জন, সিএনজি মিস্ত্রি ২ জন, টিউবওয়েল মিস্ত্রি ২ জন, টাইলস মিস্ত্রি ৩ জন, থাই মিস্ত্রি ১ জন, স্বর্ণকার ১ জন, মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ২৯ জন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, সরকারি বাংলা কলেজের ১ জন-সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০১৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ১৩.৭৭ শতাংশ। উল্লেখ্য, গত বছর এস এসসি পরীক্ষা চলাকালীন পরীক্ষা কেন্দ্রে আসা-যাওয়ার সময় ২৪ জন পরীক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

More From Author

শুধু চিকিৎসক নয়, সামাজিকভাবে জরায়ুমুখের ক্যান্সার সচেতনতা বাড়াতে হবে

প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে ঢাকাস্থ কালিগঞ্জ-আশাশুনিবাসীর সঙ্গে পরিবর্তনের অঙ্গীকারে ডা. শহিদুল আলমের মতবিনিময়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *