অভিজিৎ ব্যানার্জি, ঢাকা: তরুণদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে নীরবতা ভেঙে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা, সামাজিক কলঙ্ক দূর করা এবং ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য কার্যকর ও সহজলভ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেন, আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে।
বুধবার ৯ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘নীরবতা থেকে পদক্ষেপ: তরুণদের আত্মহত্যা বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’ শীর্ষক এক বিশেষ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। আঁচল ফাউন্ডেশন ও হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ডা. এম. এ. মুহিত বলেন, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে। এ সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকার পাবনা মানসিক হাসপাতালের আধুনিকায়ন, ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো তৈরিতে কাজ করছে। এছাড়াও, সরকার জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কাঠামো গড়ে তোলার জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে।
উক্ত কর্মসূচিতে আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ তানসেন স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর জনাব একরামুল হক সায়েম। জনাব তানসেন বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। একটি তরুণ জীবনকে সংকট থেকে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং পুরো সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মুহিত আরো বলেন, আত্মহত্যা মোকাবেলায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এককভাবে সরকার ভূমিকা রাখতে পারবে না। সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে দেখানো আইন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক স্টিগমা বাড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আইনগত কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দিতে টেলি-কাউন্সেলিং ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ‘ইটস গুড টু টক’ ক্যাম্পেইনের উদ্যোগের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
আঁচল ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সাইদ মূল বক্তব্যে বলেন, আত্মহত্যা বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব। তিনি বলেন, আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না; বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে একজন ব্যক্তি এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। কেউ আত্মহত্যার কথা বললেও তা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে প্রতি এক লাখ ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের মধ্যে প্রায় ১৮ জন আত্মহত্যায় মারা যান। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে তরুণদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। বক্তারা বলেন, এ প্রবণতা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে জরুরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর মোঃ কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “যারা আত্মহত্যার প্রচেষ্টা করে, আমরা তাদের অপরাধী মনে করি। এটা একটা বড় প্রতিবন্ধকতা। আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার ক্ষেত্রে বর্তমান আইন পরিবর্তন নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। আমদের মনে রাখতে হবে, যারা আত্মহত্যার প্রচেষ্টা করে, তাঁরা মূলত অসুস্থতা থেকে করে। অসুস্থ মানুষকে আমরা অপরাধী বলতে পারি না।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মহসিন আলী শাহ বলেন, আত্মহত্যা করতে চাওয়া অনেক মানুষই প্রকৃতপক্ষে বেঁচে থাকতে চান। তবে তীব্র মানসিক সংকট ও বিষণ্নতার কারণে তাঁরা আত্মহত্যাকে একমাত্র পথ হিসেবে দেখতে পারেন। তিনি বলেন, বিষণ্নতার যথাযথ চিকিৎসা না হলে একজন ব্যক্তি পুনরায় আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন। তাই আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর কাছে নিয়ে যেতে হবে। সেরোটোনিনের মাত্রা কমে গেলে বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি আবেগপ্রবণতা বেড়ে যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, আত্মহত্যায় ব্যবহৃত হতে পারে এমন উপকরণ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের দূরে সরিয়ে না দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং কোনোভাবেই তাঁদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা বা ক্রিমিনালাইজ করা যাবে না। তাঁদের পাশে বসে কেন এমন চিন্তা বা অনুভূতি হচ্ছে, তা জানতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দিতে হবে।
তিনি বলেন, তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো কিছু করার আগ্রহ ও প্রেরণা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই সংকটের সময়ে তাঁদের একা না রেখে পাশে থাকা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। সবার মানসিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা এক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও মানসিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
লেখক ও গবেষক গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যবহৃত কিছু কঠোর বা আঘাতমূলক শব্দও একজন মানুষকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নওফল জমির বলেন, আত্মহত্যা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে আইন, নীতি এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে যথাযথভাবে সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এ বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আত্মহত্যা একটি স্পর্শকাতর বিষয় এবং এর সঙ্গে ধর্মীয় ও আইনগত বিভিন্ন বিষয় জড়িত। মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে কেবল সামাজিক বা ধর্মীয় বিচারের আওতায় না দেখে তাঁর প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত সামাজিক ট্যাবু থেকে বেরিয়ে এসে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও কার্যকরভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৯ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করার চেষ্টা করলে বা এর জন্য কোনো পদক্ষেপ নিলে তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের বিনাশ্রম বা সশ্রম কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এ আইন বাতিল বা সংস্কার করার বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় পেশাজীবী কর্মকর্তা হাসিনা মমতাজ বলেন, আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রবণতা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে একটি অংশ পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যেতে পারেন। একই সঙ্গে যাঁরা আগে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ভবিষ্যতে আবার আত্মহত্যার চেষ্টা করার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই আত্মহত্যার চিন্তা বা পূর্ববর্তী আত্মহত্যার চেষ্টাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও এইচআরডিসির পরিচালক জিয়ানুর কবির আত্মহত্যা নিয়ে নীরবতা ও কুসংস্কার ভাঙার আহ্বান জানান। তিনি সহানুভূতিশীল আচরণ, কষ্ট শোনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইন, স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
সমাপনী বক্তব্যে এইচআরডিসির সিইও মাহবুল হক বলেন, দশটি জেলায় কমিউনিটি-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে দুইশত এর বেশি নির্যাতিত মানুষকে আত্মহত্যার চিন্তা থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করা হয়েছে। সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একইভাবে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।