প্রাক-নির্বাচনী জনমত জরিপ ২০২৬: বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, ফল নির্ধারণে ‘আনডিসাইডেড’ ভোটাররাই মুখ্য

মেহেদী হাসান, ঢাকা: আসন্ন ২০২৬ সালের বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল এন্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি), জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভ-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত- প্রি-ইলেকশন পালস: অ্যান ইন-ডেপথ অ্যানালাইসিস অব দ্য বাংলাদেশি ইলেক্টোরেট শীর্ষক এক  জনমত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

জরিপের পরিধি ও পদ্ধতি:

এই জরিপটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয় । এতে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত মোট ২২,১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশগ্রহণ করেন । ভৌগোলিক, শহর–গ্রাম ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে স্ট্রাটিফায়েড স্যাম্পলিং ডিজাইন অনুসরণ করা হয় এবং ২০২২ সালের জাতীয় আদমশুমারির ভিত্তিতে পোস্ট-স্ট্রাটিফিকেশন ওয়েটিং প্রয়োগ করা হয়েছে ।

সার্ভে ৬৪ জেলায় করা হয়েছে যেখানে সর্বমোট ২৯৫ টি  নির্বাচন আসনে করা কাভার করা হয়েছে।  যেখানে স্যাম্পল হিসেবে ২২,১৭৪ জনের তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে। 

যেখানে বরিশাল বিভাগ হতে ২,১৪১ চট্রগ্রাম বিভাগ হতে ৩,৯২৮,  ঢাকা বিভাগ হতে ৪,৮১৮ খুলনা বিভাগ হতে ৩,১৭৮, ময়মনসিংহ হতে ১২২৪৪ রাজশাহী বিভাগ হতে ২,৭৩৯, রংপুর বিভাগ হতে ২,৭৩৬, সিলেট বিভাগ হতে ১,৩৯০ জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। 

জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চিত্র:

জরিপ অনুযায়ী, বর্তমান জনসমর্থনের ভিত্তিতে ভোটের সম্ভাব্য বণ্টন নিম্নরূপ:

বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি): ৩৪.৭ শতাংশ 

জামায়াতে ইসলামি: ৩৩.৬ শতাংশ 

আনডিসাইডেড (সিদ্ধান্তহীন) ভোটার: ১৭.০ শতাংশ 

ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি): ৭.১ শতাংশ 

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ৩.১ শতাংশ 

অন্যান্য দল: ৪.৫ শতাংশ 

যদিও মেশিন লার্নিং (ML) প্রজেকশন অনুযায়ী আনডিসাইডেড ভোটারদের ঝোঁক বিবেচনায় নিলে বিএনপির সমর্থন ৪৩.২% এবং জামায়াতে ইসলামির সমর্থন ৪০.৮%-এ পৌঁছাতে পারে, 

ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ও দলের সমর্থনের ভিত্তি:

১. বিএনপি: অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা-

বিএনপির ৭২.১ শতাংশ সমর্থক দলটির অতীত অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতাকে সমর্থনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন । ডেমোগ্রাফিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে: ৩০-৪৪ বছর (৩৮.৪%) এবং ৪৫-৫৯ বছর (৩৭.৪%) বয়সী কর্মক্ষম ভোটারদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন বেশি ।

 পেশাজীবীদের মধ্যে কৃষক (৪২.৬%) এবং শ্রমিকদের (৪০.৬%) মধ্যে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে ।

২. জামায়াতে ইসলামি: সততা ও পরিবর্তনের রাজনীতি

জামায়াতে ইসলামির সমর্থকরা দলটিকে মূলত ‘কম দুর্নীতিগ্রস্ত’ (৪৪.৮%) এবং ‘সততার ভাবমূর্তি’ (৪০.৭%)-এর কারণে সমর্থন করছেন । তাদের সমর্থনের ভিত্তি হলো: 

তরুণ প্রজন্ম: ১৮-২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন সর্বোচ্চ (৩৩.৬%)।  উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী: স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দলটির সমর্থন ৩৭.৪%, যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি । ডিজিটাল মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে দলটি এগিয়ে আছে।

৩. এনসিপি ও জুলাই বিপ্লবের প্রভাব

নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি)-কে সমর্থন করার পেছনে ৩৬.৭% মানুষ ‘জুলাই বিপ্লবে ভূমিকা’-কে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক দিয়ে, বিএনপির প্রতি সমর্থন বেশী যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নাই (৩৯.৩%) ও প্রাইমারী পর্যন্ত যারা পড়াশোনা করেছেন (৪০.২%) তাদের। আবার জামায়াতের ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর শেষ এমন ব্যাক্তিগত বেশী সমর্থন(৩৭.৪%) প্রকাশ করেছেন।

এ জায়গায় বিএনপির প্রতি সবচেয়ে কম সমর্থন স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ব্যাক্তিদের থেকে (২৫.৯%) এবং জামায়াতের প্রতি কম যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নাই (২৯.৮%)।

জেন্ডার ভিত্তিক বিশ্লেষণ:

পুরুষ:

বিএনপি: ৩৬.৭%, জামায়াত: ৩৪%, এনসিপি: ৬.৪%, সিদ্ধান্ত নেই: ১৫.৬%।

নারী:

বিএনপি: ৩১.৩%, জামায়াত: ৩৩.১%, এনসিপি: ৮.২, সিদ্ধান্ত নেই: ১৯.৬%।

আনডিসাইডেড ভোটার ও আস্থাহীনতা:

জরিপে ১৭ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন। তাদের মধ্যে ৩০.১% ভোটার জানিয়েছেন তারা কোনো রাজনৈতিক দলকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না এবং ৩৮.৬% ভোটার কোনো মতামত দেননি । এই ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।

জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করার প্রধান কারণ কী? এই প্রশ্নের উত্তরে ৪৪.৮% মানুষ জামায়াতের কম দূর্নীতিকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সৎ ইমেজের কথা বলেছেন ৪০.৭% মানুষ। সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে ৩০.৩%, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কে ২৫.৫%, জুলাই বিপ্লবে অবদানকে সমর্থনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ১৬.৪% মানুষ।

বিএনপিকে সমর্থনের প্রধান কারণ কি এই প্রশ্নের জবাবে অতীত অভিজ্ঞতাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ৭২.১% মানুষ। এছাড়া ৩৪.২% গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে ২৬.৪%, ১৪.৮% সৎ ইমেজকে, ১৪.৫% সাম্প্রতিক ইতিবাচক কাজকে১৪.৫% এবং ৯.৯% জুলাই আন্দোলনের ভূমিকাকে তাদের সমর্থনের কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এনসিপিকে সমর্থনের কারণ হিসেবে জুলাই বিপ্লব কে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ৩৬.৭% মানুষ, মূলত এটাই তাদেরকে সমর্থনের প্রধান কারণ। এছাড়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ৩০.৪%, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে ২৯.৯%, কম দূর্নীতিকে ২৬.৯%, সাম্প্রতিক ইতিবাচক ইমেজকে ২২.৪% চিহ্নিত করেছেন তাদের এনসিপিকে সমর্থনের কারণ হিসেবে।

ফলাফল প্রকাশ পরবর্তী পর্যালোচনায় সোয়াস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. মুশতাক খান তার পর্যালোচনায় বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ মূলত “পরিবর্তন বনাম স্থিতিশীলতা” এই বয়ানের মধ্যে কাউকে বেছে নিবে। 

এখানে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানুষ পুরোনো সিস্টেমের পরিবর্তন চেয়েছিলো। স্থিতিশীলতার নামে পুরোপুরি পুরোনো সিস্টেম গেলে মানুষ এটাকে গ্রহণ করবে না। আবার, খুব বেশী পরিবর্তনও রাতারাতি সম্ভব না।

ফলে এই স্থিতিশীলতা এবং পরিবর্তনের মধ্যে যে রাজনৈতিক দল বা জোট মানুষকে একটি বাস্তবভিত্তিক অবস্থান দেখাতে পারবে সেই দল বা জোটই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

এই জরীপ আমাদের জন্য একটি সুযোগ; এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করার জন্য।

বিডিজবসের সিইও ফাহিম মাশরুর আগের করা কয়েকটি জরীপের সাথে এ জরীপের সাথে তুলনামূলক আলোচনা করেন। 

উনি দেখান যে ইনোভিশনের করা প্রথম জরীপে এনসিপির ভোট উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ছিলো না। কিন্তু, IRI বা এই জরিপে এনসিপির ভোট ৫-৭% এমন দেখা যাচ্ছে। যা এনসিপির জন্য খুশীর ব্যাপার।

এই জরিপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটা আগের জরিপগুলোতে দেখা যায়নি যে, নারীরা বিএনপি থেকে জামায়াতকে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছে। আগের জরিপগুলোতে বিএনপি এ জায়গায় এগিয়ে থাকলেও এখন জামায়াত এ জায়গায় লিড নিয়েছে।

এ জরিপ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। 

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডীন ড. ওয়ারেসুল কারীম বলেন, এই জরিপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দুইটি। নারী এবং শিক্ষিত ভোটারদের ভোট দেয়ার প্যাটার্ন। এই দুই জায়গায়ই দেখা যাচ্ছে, জামায়াত এগিয়ে আছে বিএনপি থেকে; যেগুলো আগে করা জরিপগুলোতে দেখা যায় নি। 

আগে বাংলাদেশের ভোটের একটি কমন প্যাটার্ন ছিলো ভোট দুইটি ব্লকে ভাগ হতো। এক ব্লক আওয়ামী এবং আরেকটি ব্লক এন্টি – আওয়ামী। এন্টি আওয়ামী ব্লকে বিএনপি এবং জামায়াতের ভোটগুলো থাকতো।

ফলে, জামায়াত যখন ১৯৯৬-এ ৪-৫ শতাংশ ভোট পায় তখন এমন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী যে আধিপত্যবাদ বিরোধী তথা এন্টি-আওয়ামী ভোট একই বাক্সে যাতে যায় সে কারণে অনেক জামায়াতের ভোটও বিএনপির বাক্সে গেছে।

১৯৯১ সালে জামায়াত ১২-১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলো। তবে সেটা ২২০ টার মতো আসন থেকে। ৩০০ থেকে না। ফলে জামায়াতের ভোট ১০ শতাংশের কাছাকাছি এমন যে বয়ান তা আসলে পুরোপুরি সঠিক না।

তবে এখন যেহেতু আওয়ামীলীগ নাই, সেহেতু আগের ঐসব ব্লকের হিসাব কাজ করবে না। 

নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার ওমর নাফিস আব্দুল্লাহ মনে করেন ক্যাম্পাসে হওয়া ছাত্র সংসদগুলোর ভোটের একটা প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে, যেটি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক ড. শিব্বির আহমদও মনে করেন। ড. সিব্বির এই জরিপে ভোট দিতে আগ্রহী না হওয়া ২-৩% মানুষজনের একটি অংশকে আওয়ামীলীগের ভোটার বলে মনে করেন; যেহেতু ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা তার নেতা-কর্মীদের ভোট দিতে মানা করেছেন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল (অব) আমসা আমিন এবং কানাডার রেজিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ। 

উপসংহার:

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি হবে ‘প্রয়োজনের শ্রেণিবিন্যাস’ (বিএনপির অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা) এবং ‘মূল্যবোধের শ্রেণিবিন্যাস’ (জামায়াতের সততা ও ন্যায়বিচার)-এর মধ্যে এক দার্শনিক ও রাজনৈতিক লড়াই। ভোটারদের একটি বিশাল অংশ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।

More From Author

প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে ঢাকাস্থ কালিগঞ্জ-আশাশুনিবাসীর সঙ্গে পরিবর্তনের অঙ্গীকারে ডা. শহিদুল আলমের মতবিনিময়

রাজধানীতে চালককে কুপিয়ে যাত্রীবেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recent Comments

No comments to show.